গত এক দশক ধরে গার্মেন্ট শিল্পে অন্যতম শীর্ষ রফতানিকারক হা-মীম

দূরদর্শী ভাবনা থেকে ১৯৮৪ সালে ব্যবসায়িক যাত্রা শুরু করেন উদ্যোগী মানুষ এ কে আজাদ। সেই থেকে তার গড়ে তোলা হা-মীম গ্রুপে একে একে যুক্ত হয়েছে ২৬টি কারখানা।

দূরদর্শী ভাবনা থেকে ১৯৮৪ সালে ব্যবসায়িক যাত্রা শুরু করেন উদ্যোগী মানুষ এ কে আজাদ। সেই থেকে তার গড়ে তোলা হা-মীম গ্রুপে একে একে যুক্ত হয়েছে ২৬টি কারখানা। দীর্ঘ তিন দশকের যাত্রায় এ গ্রুপের ওভেন পোশাক পণ্য প্রস্তুতকারক কারখানাগুলোর মধ্যে আছে আর্টিস্টিক ডিজাইন লিমিটেড, হা-মীম অ্যাপারেলস লিমিটেড, দ্যাটস ইট গার্মেন্টস লিমিটেড, দ্যাটস ইট স্পোর্টসওয়্যার লিমিটেড, দ্যাটস ইট ফ্যাশন লিমিটেড, এক্সপ্লোর গার্মেন্টস লিমিটেড, ক্যাজুয়াল গার্মেন্টস লিমিটেড, অ্যাপারেল গ্যালারি লিমিটেড, রিফাত গার্মেন্টস লিমিটেড, ক্রিয়েটিভ কালেকশন লিমিটেড, নেক্সট কালেকশনস লিমিটেড, হা-মীম ডিজাইন লিমিটেড। এর মধ্যে অন্যতম রফতানিকারক ইউনিট হলো রিফাত গার্মেন্টস লিমিটেড। যে প্রতিষ্ঠান বিগত কয়েক বছরে জাতীয় রফতানি ট্রফি অর্জন করেছে। প্রতিষ্ঠানটির যাত্রা শুরু হয় ২০০৪ সালে। এসব কারখানা আশুলিয়া, টঙ্গী, টাঙ্গাইল ও কালিগঞ্জ অঞ্চলে অবস্থিত। এগুলোর সক্ষমতা দিনপ্রতি তিন লাখ পিস। হা-মীম গ্রুপের হেড অফিস ঢাকার তেজগাঁওয়ে অবস্থিত।

হা-মীম গ্রুপের সোয়েটার উৎপাদনকারী কারখানার মধ্যে আছে দ্যাটস ইট নিট লিমিটেড ও দ্যাটস ইট সোয়েটার লিমিটেড। ওয়াশিং কারখানা আছে সাতটি, যেগুলোর ওয়াশিং সক্ষমতা দিনপ্রতি তিন লাখ পিস। ডেনিম কাপড়ের কারখানাটি হলো হা-মীম ডেনিম মিলস লিমিটেড। এমব্রয়ডারি, প্রিন্টিং ও অ্যাকসেসরিজের মতো পোশাকের আনুষঙ্গিক পণ্য উৎপাদন সক্ষমতাও আছে হা-মীম গ্রুপের। সব মিলিয়ে এ গ্রুপের আওতায় ২৬টি পোশাক রফতানিকারক প্রতিষ্ঠানে প্রডাকশন লাইন সংখ্যা ৩৭০-এর বেশি। প্রতি মাসে হা-মীম গ্রুপের উৎপাদন সক্ষমতা ৮০ লাখ পিস। গ্রুপের অধীনে কর্মরত কর্মকর্তা ও শ্রমিক সংখ্যা প্রায় ৭০ হাজার। ট্রাউজার, জিনস, কার্গো, স্কার্ট, শার্ট, জ্যাকেট, লেডিস পোশাক তৈরির জন্য অটো ট্রিমার এবং অত্যাধুনিক মেশিনের ব্যবহার করা হয়। কাটিংয়ের ক্ষেত্রে অটো কাটার মেশিন ব্যবহার করা হয়। ফ্যাব্রিক অনুসারে ৫০ শতাংশ ডেনিম এবং ৫০ শতাংশ নন-ডেনিম পণ্য উৎপাদন করে প্রতিষ্ঠানটি।

৩৯২ জনের মার্চেন্ডাইজারের দুটি দল নিরলসভাবে কাজ করছে। তাদের মূল লক্ষ্য ক্রেতা এবং কারখানার মধ্যে একটি শক্তিশালী বন্ধন গড়ে তোলা। কারখানার সঙ্গে যুক্ত ক্রেতাদের সময়মতো সহযোগিতা করার জন্য মার্চেন্ডাইজিং সাব-গ্রুপগুলো তৈরি করা হয়। বাংলাদেশের চট্টগ্রাম সমুদ্রবন্দর, বেনাপোল স্থলবন্দর এবং ঢাকা বিমানবন্দরে হা-মীম গ্রুপের নিজস্ব সিঅ্যান্ডএফ অফিস রয়েছে। যার মাধ্যমে দ্রুত ক্লিয়ারিং, ফরওয়ার্ডিং এবং সময়মতো আমাদের সব পণ্য পাঠানোর সুবিধা পাওয়া যায়।

বাংলাদেশের অন্যতম শীর্ষ পোশাক প্রস্তুত ও রফতানিকারক কোম্পানি হা-মীম। যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপসহ বিশ্বের বড় ক্রেতারা পোশাক ক্রয় করে হা-মীম গ্রুপ থেকে। এসব ক্রেতা প্রতিষ্ঠানের মধ্যে আছে গ্যাপ, ভিএফ, আমেরিকান ঈগল, অ্যাম্বারক্রম্বি অ্যান্ড ফিচ, কোহলস, পিভিএইচ, এইচঅ্যান্ডএম, এসপিরিট, অশকোশ, জারা, জেসিপেনি, টমি হিলফিগার, লুইস রাফায়েল, রেইটম্যান্স, নাপাপিজরি, টশ টেইলর, নেক্সট, টিসিপি, আসমারা, কন্তুর, জাস্টিস ইত্যাদি।

আরামদায়ক ও ফ্যাশনেবল হওয়ায় ডেনিম পোশাকের জনপ্রিয়তা বিশ্বজুড়ে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে যে ডেনিম পোশাক পাওয়া যায় তার সিংহভাগই উৎপাদন হয়ে থাকে বাংলাদেশে। ডেনিম পোশাক উৎপাদনকারী দেশী প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে হা-মীম গ্রুপ একটি উল্লেখযোগ্য অবস্থান তৈরি করতে পেরেছে। কটন টুইল বা স্ট্রেচ টুইল থেকে তৈরি একপ্রকার ফ্যাব্রিকই ডেনিম। দেশে উৎপাদিত ডেনিম ফ্যাব্রিকের মধ্যে ১৪ শতাংশের বেশি হিস্যা হা-মীম গ্রুপের। প্রতিষ্ঠানটি বছরে ডেনিম ফ্যাব্রিক উৎপাদন করে প্রায় ৬০ মিলিয়ন গজ, যা রফতানি হয় যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপ, যুক্তরাজ্যসহ পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের ক্রেতাদের পোশাক তৈরিতে সরবরাহ করে। এছাড়া হামীম গ্রুপের রয়েছে ওভেন টেক্সটাইলস ও সুতা উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান। যেখানে টেক্সটাইলসের উৎপাদন সক্ষমতা বছরে প্রায় ৩০ মিলিয়ন গজ। সুতা উৎপাদনে হা-মীম গ্রুপের সক্ষমতা বছরে প্রায় ৩২ হাজার ৪০০ টন। হা-মীম গ্রুপ নিজেই প্রায় ৫০ শতাংশ সুতা ব্যবহার করে নিজেদের কাপড় উৎপাদনে।

প্রায় ২০ বছর ধরে তৈরি পোশাক খাতে ডেনিম নিয়ে কাজ করছে হা-মীম গ্রুপ। হা-মীম গ্রুপের ডেনিম ফ্যাব্রিকস ও ডেনিম পোশাক নিয়ে কার্যক্রম শুরু হয় ২০০৭ সালে। প্রথম ক্রয়াদেশ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র থেকে আসে। বর্তমানে বিশ্বের নামিদামি ব্র্যান্ড রয়েছে হা-মীমের ক্রেতা তালিকায়। যেমন বিশ্বে পোশাকের নামি ব্র্যান্ড আমেরিকান ঈগল, গ্যাপ, জেসিপেনি, জারা, নেক্সট, এইচঅ্যান্ডএম, এমঅ্যান্ডএস, এলডিআই, ইউনিক্লো, কিয়াবি, লেফটিস ইত্যাদি। প্রতিষ্ঠানটির মোট রফতানির ৬০ শতাংশ ইউরোপে, ৩৫ শতাংশ যুক্তরাষ্ট্রে ও বিশ্বের অন্য দেশগুলোয় ৫ শতাংশ রফতানি হয়। ২০২৩ সালে একক ইউনিট হিসেবে দেশের শীর্ষ রফতানিকারক প্রতিষ্ঠানের তালিকায় চতুর্থ স্থানে ছিল হা-মীম গ্রুপের কারখানা রিফাত গার্মেন্টস লিমিটেড।

করোনাকাল হা-মীম গ্রুপের জন্য কঠিন ছিল। সেই সময় সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ছিল কারখানা চালু রাখা। ক্রয়াদেশের পরিমাণও ছিল অনেক কম। পণ্যের দাম কমাতেও চাপ ছিল ক্রেতাদের, তার পরও কিছু ক্রয়াদেশ তারা নিয়েছে কারখানা চালু রাখার স্বার্থে। এতে বেশকিছু ক্রয়াদেশে কারখানাটির লোকসান গুনতে হয়েছে। কিন্তু শ্রমিকদের স্বার্থে তারা সে সময় কাজ চলমান রেখেছিল। হা-মীম গ্রুপ ২০২০ সালে ২০১৯ সালের সমপরিমাণ রফতানি করতে পারেনি। ২০১৯-এর তুলনায় ৫ কোটি ডলারের রফতানি কম হয়েছে।

শুরুতে উৎপাদন ছিল সাত লাখ গজ, তিন বছর পর ১৫ লাখ গজ এবং ছয় বছর পর ৩০ লাখ গজ ডেনিম ফ্যাব্রিক উৎপাদন সক্ষমতা অর্জন করে হা-মীমের ডেনিম কারখানা। বর্তমানে ৪৫ লাখ গজ ফ্যাব্রিক উৎপাদন করলেও প্রতিষ্ঠানটির ৫০ লাখ গজ ফ্যাব্রিক উৎপাদন সক্ষমতা রয়েছে। প্রতি মাসে ৯০ লাখ পিস তৈরি পোশাক উৎপাদন করে হা-মীম গ্রুপ। প্রতিষ্ঠানটি সরাসরি নিজেরাও রফতানি করে, আবার তৃতীয় পক্ষের মাধ্যমেও করে থাকে।

২০০৭ সালের দিকে হা-মীম ডেনিম উৎপাদনের সঙ্গে যুক্ত হয়। প্রথম ক্রয়াদেশ পায় যুক্তরাষ্ট্র থেকে। পরে ইউরোপ থেকে আসে দ্বিতীয় ক্রয়াদেশ। এভাবেই শুরু। বর্তমানে বাংলাদেশ থেকে যারা ডেনিম রফতানি করে তাদের মধ্যে প্রথম সারিতে অবস্থান করছে হা-মীম। শুরুতে কারখানাটি মাত্র সাত লাখ টন ফ্যাব্রিক উৎপাদন করত। বর্তমানে কারখানাটির উৎপাদনক্ষমতা প্রায় ৫০ লাখ গজ।

আরও